Home / STORY LESSON / অতঃপর তাদের ভালোবাসা দিবস

অতঃপর তাদের ভালোবাসা দিবস

টুংটুং শব্দ করে রিক্সা ছুটে চলেছে। চারদিকে ঝলমলে রোদ উঠেছে যেখানে সকালে কুয়াশার জন্য কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। সময় যত গড়িয়েছে কুয়াশা কেটে গেছে আর রোদের তীব্রতা বাড়তে শুরু করেছে। সূর্যটা এখন ঠিক মাথার উপর। ঘামে শরীরের জামা কাপড় সব ভিজে গেছে, গামছা দিয়ে মুখটা মুছে নিল বাদল। গরমে একেবারে নাকাল অবস্থা, ফাল্গুন চৈত্র মাসে এই এক সমস্যা কখনও হাড় কাপানো শীত আবার কখনো ঠাঠা রোদ। আজকের পরিস্তিতি একটু ভিন্ন।

চারদিকে কেমন যেন উৎসব মূখর পরিবেশ, তরুন তরুণী কত সাজেই না সেজেছে। জোড়ায় জোড়ায় বেরিয়েছে সবাই। সবার হাতেই ফুলের ছড়াছড়ি, কারো হাতে রক্তের মত লালগোলাপ আবার কারো হাতে রজনীগন্ধা। মেয়েরা সবাই শাড়ি পড়েছে, কেউ কেউ আবার খোপায় বেলিফুলের মালা গুঁজেছে।একেকজনকে পরীর মত লাগছে। ছেলেরা বেশিরভাগ পাঞ্জাবী পরেছে,তাদের মাঝে কেমন যেন নতুন বর নতুন বর ভাব চলে এসেছে। দেখতে ভালোই লাগছে।

Loading...

আজ বসন্তের দ্বিতীয় দিন আর পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে ভালোবাসা দিবস। তরুণ তরুণীদের মাঝের এই আয়োজন অবশ্য বসন্তের জন্য না, তাদের এই আয়োজন ভালোবাসা দিবসের জন্য। বসন্তের জন্য তারা আয়োজন করেনি তা কিন্তু না। আয়োজন সেটার জন্যও ছিল, বসন্ত বরনের আয়োজন। সব মেয়ে মাথায় ফুলের মুকুট দিয়ে সেজেছিল, সে আয়োজন হয়েছে গতকাল। আজ চলেছে ভালোবাসার জন্য আয়োজন। আজকে কেউ ঘটা করে পছন্দের মানুষকে নিজের মনের কথা জানাবে আবার কেউ আগে থেকেই গড়ে ওঠা ভালোবাসাটাকে নতুন করে সাজিয়ে নিবে। সব কিছুই ভালোবাসাকে ঘিরেই, সারাদিন চলবে এভাবেই।

তারা আজ সারাদিন এখানে সেখানে ঘুরবে, খাওয়া দাওয়া করবে তারপর শেষবেলায় সূর্যাস্তের সাথে সাথে পাখির মত নিড়ে ফিয়ে যাবে। কেউ কেউ আবার হুতুম পেচার মত নিশাচর হয়ে রাতেও ঘুরবে।

বাদল এসব এই শহরে এসেই দেখেছে জেনেছে, গ্রামে এমন কখনও দেখেনি সে। প্রথম প্রথম যখন এসব দেখেছিল তখন কেমন যেন লাগত, কিন্তু এখন আর এসব স্বাভাবিক মনে হয়। বাদল গ্রাম থেকে শহরে এসেছে বছর চারেক হবে।

মাহমুদাকে নিয়ে সেই যে গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেছিল আর গ্রামে ফিরে যাওয়া হয়নি। এই চার বছরে মাহমুদা কিছুই পায়নি বাদল কাছ থেকে, তবুও কোনদিন আভিযোগ করে কিছু বলেনি। মাহমুদার জন্য আজ কিছু ফুল নিয়ে যেতে পারলে ভাল হত। ফুল পেলে খুব খুশি হয় মাহমুদা, গ্রামে থাকতে বাদল যখন মাহমুদাকে পুকুরের থেকে শাপলা তুলে দিত তখন কি খুশিটাই না হত মাহমুদা।

বাদল মনে মনে ঠিক করে ফেলল আজ মাহমুদার জন্য কয়েকটা রক্তলাল গোলাপ নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু গোলাপের দাম কত কে জানে? অবশ্য রিক্সার প্যাসেঞ্জার ছেলেমেয়ে দুটোকে জিজ্ঞেস করা যায়। কিন্তু বাদল এর জিজ্ঞেস করার সাহস হল না। বাদল শুধু একবার পিছনে ফিরে তাকাল, কিন্তু ওরা দুজন নিজেদের নিয়ে এতটাই ব্যাস্ত ছিল যে বাদল তাকানোটা ওরা বুঝতেই পারল না।

বাদল আবার সামনে তাকিয়ে রিক্সা চালনোয় মন দিল আর মনে মনে মাহমুদার হাসিমাখা মুখটা দেখতে চেষ্টা করল।

সারাদিন রিক্সা চালিয়ে বাদল এর মোট আয় হল পাঁচশ টাকা তার থেকে মালিককে দিতে হল একশ টাকা। পকেটে আছে চারশ টাকা, সেটা নিয়ে বাদল বাজার করতে হবে আরও হয়ত কিছু বাচবে সেটা দিয়ে না হয় কয়েকটা ফুল কেনা যাবে। বাজার করতে গিয়ে বাদল মনে হল মন (বাদল এর তিন বছর বয়সের ছেলে) সকালে আসার সময় মাংস নিয়ে যেতে বলেছিল।

কিন্তু যে টাকা আছে তাতে মাংস কিনতে গেলে পরের দিন তার কিস্তি দেওয়া হবে না। ছেলেটার অসুস্থতার জন্যই তাকে ঋণ নিতে হয়েছিল, সেটাই এখন গলার ফাস হয়ে আটকে আছে। কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছেনা বাদল ।

ভাবতে ভাবতে বাদল এর চোখে পানি চলে এল, গরিব হবার জন্য মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিল সে। চোখের পানি গামছা দিয়ে মুছে মাংস বাদ দিয়েই বাজার করে ফেলল বাদল । পকেটে আর মাত্র দুইশ বিশ টাকা, দুইশ টাকা কিস্তিতে যাবে বাকি বিশ টাকায় কি গোলাপ হবে? কে জানে যদি হয়ে যায় সেই আশার বাদল বাজারের ব্যাগটা হাতে নিয়ে ফুলের দোকানের দিকে হাটা দিল।

দোকান ভর্তি নানা রঙের ফুল যার বেশিরভাগের নামই জানেনা বাদল । সাদা সাদা কি একগুচ্ছ ফুলে বাদল এর চোখ আটকে গেল, লাল গোলাপের কথা ভুলেই গেল। মনে মনে ভাবল এটাই কিনবে, দোকানের ছেলেটাকে ফুলটার দাম জিজ্ঞেস করল বাদল ।

দোকানের ছেলেটা এমনভাবে তাকালো যেন মহাঅন্যায় করে ফেলেছে বাদল । তাচ্ছিল্য ভরে জবাব দিল, ও কেনার সামর্থ্য তোমার হবে না, দাম শুনে কি করবে? রাগে গা জ্বালা করতে লাগল বাদেলর কিন্তু কিছুই বলতে পারলনা। একবার ইচ্ছে হল পকেটের পুরো টাকা দিয়ে ওই ফুল কিনে ছেলেটার কথার উচিত জবাব দিবে কিন্তু পরোক্ষনেই মনে হল গরিবদের এত সহজে রেগে গেলে চলে না। দোকানের ছেলেটা বাদলকে ব্যাঙ্গ করে বলে উঠল তুমি বরং কুমড়ো ফুল কিনে নিয়ে যাও বাজার থেকে। বাদল আর কথা না বাড়িয়ে বাড়ির পথে হাটা দিল। চোখ জলে ভরে এসেছে, মনে মনে ভাবল কোনদিন যদি বাদল এর অনেক টাকা হয় তাহলে অই দোকানে গিয়ে দোকানের সব ফুল কিনে নিবে আর দোকানের ছেলেটাকে কিছু কথা শুনিয়ে আসবে। এসব ভাবতে ভাবতেই আনমনে হেসে ফেলল বাদল কি ছেলে মানুষের মত ভাবছে সে।

বাড়ির কাছাকাছি আসতেই বাদল এর চোখগুলো চিকচিক করে উঠল। বাড়ির কাছে মজা পুকুরটার কচুরিপানাগুলোয় ফুল ফুটেছে। হালকা বেগুনি রঙের ফুলগুলোকে স্রষ্টার আর্শিবাদ বলে মনে হল বাদল এর। রাস্তার পাশে বাজারের ব্যাগটা রেখে পানিতে নেমে পড়ল বাদল পানি বরফ ঠান্ডা হয়ে আছে কিন্তু বাদলের সেটা কিছুই মনে হল না।

তার মাঝে কাজ করছে উত্তেজনা, কচুরিপানার ফুলগুলো একহাতে নিয়ে আর একহাতে ব্যাগ নিয়ে ভেজা কাপড়ে কাঁপতে কাঁপতে বাড়িতে এল বাদল।

বাদল কে কাপতে দেখে মাহমুদা ছুটে এল বাদলের কাছে, কি হয়েছে জানতে চাইল? বাদল হাসিহাসি মুখ করে মাহমুদার দিকে ফুলগুলো বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এইগুলান তোমার জন্য।

আজ তো ভালোবাসা দিবস তাই তোমার জন্য ফুল নিয়ে এলাম। প্রথমে গোলাপ আনতে চেয়েছিলাম কিন্তু টাকার জন্য কিনতে পারি নাই তাই আসার সময় এইগুলান পুকুর থেকে তুলে আনছি। তুমি কিছু মনে কইর না পরেরবার গোলাপ নিয়া আসমু। এবার এটাই নেও।”

মাহমুদা বাদলের হাতথেকে ফুলগুলো নিয়ে কেদে ফেলল।

এ কান্না সুখের কান্না, ভালোবাসার কান্না যা ওই দামি ফুলের চেয়েও দামি, যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না।

লেখকঃ সোহেল সাইফ

 

Check Also

জঙ্গীদের প্রতি ঘৃনা বাড়ানোর বড়ি!

১) আজ মুসলমান সম্প্রদায়ের এক বড় উৎসব।আমার এধরনের লেখা ঠিক হচ্ছেনা তবু দেশের পরিস্থিতি আমাকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published.