Home / STORY LESSON / নীল রঙের শাড়িতে অপেক্ষার প্রহর !!!

নীল রঙের শাড়িতে অপেক্ষার প্রহর !!!

রিয়া শিমুল গাছটার নিচে একলা বসে আছে। নীল রঙের শাড়ি পড়ে আসার কথা ছিলো তার। কিন্তু অনেক খুঁজেও মায়ের নীল রঙের শাড়িটা পায়নি সে। ভীষণরকম মন খারাপ করে শেষবধি নিজেরই নীল রঙের সালোয়ার কামিজ টা পড়ে নিয়েছে, সাথে নীল চাদর।

রিয়াকে সব কাপড়েই মানিয়ে যায়, কিন্তু আজ একটু বেশিই অসাধারণ লাগছে তাকে। শীতের হিম হিম ঠান্ডা পড়া শুরু করে দিয়েছে। বিকেল গড়িয়ে এলো বলে।

সাকিবের আসার কথা। কিন্তু প্রায় একটা ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করেও সাকিবের দেখা মিলল না। রিয়া সেলফোন থেকে কল দিলো তার পরিচিত নাম্বারটিতে। রিং বেজে যাচ্ছে। কেউ পিক করছে না। রিয়ার টেনশন হচ্ছে। আরো কিছু সময় রিয়া পার্কটার দক্ষিণের প্রান্তে থাকা শিমুল গাছটার নিচে বেঞ্চটাতে বসে রইলো। ফোন করে যাচ্ছে অবিরত।

রিয়া টেনশন করবে না রাগ করবে, এখন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা। শেষপর্যন্ত টেনশনই করলো। ফোন রিসিভ করেনি সাকিব। সাড়ে সাতটা বাজার পর পার্কটা সম্পূর্ণ নীরব হয়ে এলো। রিয়া চাইলেও আর ওয়েট করতে পারবে না। ইচ্ছে হচ্ছে সারারাত ওয়েট করে সাকিবের জন্য। কিন্তু সম্ভব নয়। বাড়ি ফিরে চললো সে। জানেনা সাকিব কেনো আসেনি। তবে অনেক কান্না পাচ্ছে তার।

রিকশায় বসে ঝরঝর করে কেঁদে দিলো রিয়া। রিকশাওয়ালা কি বুঝলো কে জানে, রিয়ার কাছ থেকে রিকশাভাড়া নিলো না। রাত বারোটা প্রায়। ব্যালকনি জুড়ে নীরবতা কিংবা শুন্যতা। রিয়া চুপচাপ বসে আছে।

সাকিব আর যোগাযোগ করেনি। মনটা বড্ড খারাপ লাগছে তার। অতীতের কিছু স্মৃতি নাড়া দিয়ে যাচ্ছে মনের ভেতর। প্রায় তিনবছর আগের স্মৃতি খুঁজে বেড়ালো স্মৃতির পুরোনো পাতা গুলোতে।

সেদিন অনেক রাতে হঠাৎ কল এসেছিলো রিয়ার ফোনে। রিসিভ করার পর অপর পাশ থেকে তাড়াহুড়া করে অনর্গল কিছু কথা বলে গেলো। রিয়া বুঝতে পারলো ভুল করে ছেলেটা রং নাম্বারে কল দিয়েছে, এসাইনমেন্ট নিয়ে তার এক বন্ধুকে কিছু বলতে চাচ্ছিলো সে। রিয়া জানালো, আপনি রং নাম্বারে কল দিয়েছেন। আমি মোটেও আকাশ নই। -সরি সরি। আসলে আমার ফোনসেট হারিয়ে ফেলেছি, ব্যাক আপ থেকে নাম্বার নিয়েছি তো, টাইপিং মিসটেক। আবারো সরি। আমি আবারো সরি।

ছেলেটার এতো সরি শুনে কিছুটা হাসি আসলো রিয়ার। বোকার মত একটা প্রশ্ন করে বসলো, নাম কি আপনার? ছেলেটা তেমন কিছু মনে করলো বলে মনে হয় না। সাদাসিদে ভাবে নিজের নাম বলে রিয়ার নামটাও জনতে চাইল।

অপরিচিত নাম্বার থেকে আসা একটা কল, অপরিচিত একটা ছেলে, কিন্তু রিয়া সেদিন কেন সেই অপরিচিত নাম্বারের অপরিচিত ছেলেটার সাথে আধঘন্টা কথা বলেছিলো, তা সে আজও জানে না! সাকিব ভাল গান গাইতে পারতো।

গানের কন্ঠেই পাগল করে দিয়েছিলো সে রিয়াকে। কিন্তু রিয়া তা কখনো বুঝতে দিতো না। সাকিব একদিন রিয়াকে প্রপোজ করে বসলো। না বলার সামর্থ্য ছিল না রিয়ার কিন্তু হ্যাঁ ও সে বলেনি তখন। প্রপোজের পরও দুই বছর এমনিতেই কেটে গেলো। সাকিব আর জানতে চাইল না রিয়া কি নতুন করে তাকে পছন্দ করতে পারলো কিনা। রিয়াও ছটফট করে গেছে এই সময়টা।

অবশেষে একদিন ঠিক করলো সাকিবকে আনুষ্ঠানিক ভাবে হ্যাঁ বলবে। সময় চাইল একদিন অনেকক্ষণের জন্য। বিচক্ষণ বুদ্ধির সাকিব বুঝে ফেললো ব্যাপারটা। রিয়াকে বললো নীল শাড়ি পড়ে আসার জন্য। রিয়া আসলো কিংবা সাকিব এলো না!!

রিংটোন এর শব্দে বাস্তবে ফিরে এলো রিয়া। শিলা ফোন দিয়েছে। রিয়ার বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠলো। শিলা সাকিবের ছোট বোন। এতো রাতে কেন ফোন দিতে যাবে সে। রিয়ার হাত কাঁপছে। পাওয়ার বাটনে অনেক কষ্টে প্রেস করলো সে।

“হ্যালো ….. ” ————————— ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। গ্রেভ ইয়ার্ডের সবগুলো কবরেই নাম্বার ফলক আছে, এপিটাফ ও আছে কোনটা কোনটাতে। ডানপাশের লেনটা ধরে চলে গেলে শেষ মাথায় ৪৩ নাম্বার কবরটা পড়ে। ঠিক তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল এক মধ্যবয়স্ক মহিলা। চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা। চুলে হালকা পাকন ধরেছে। নীল রঙের শাড়ির আঁচল টেনে রেখেছে।

যদিও অনেক বৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু এই অবেলায় নেমে আসা বৃষ্টিকে সে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছেনা। হাতে পুরু কাগজের নীল রঙেরএকটা খাম। তার ভেতর থেকে নীল গোলাপের ১২ টা পাপড়ি বের করে আনলো সে। গুনে গুনে কবরের উপর রাখলো পাপড়িগুলো। পাপড়িগুলো কবরের উপর রাখার সময় তার মমতা আর ভালোবাসার বহি:প্রকাশ টুকু প্রকাশ পেয়ে গেলো।

অবশ্য একজন ছাড়া আর কেউ ই তা দেখলো না। নিশ্চুপ ভালোবাসার প্রতিফলন গুলো বোধহয় এমনই হয়। একে একে কেটে যাচ্ছে বছর। সাথে বেড়ে চলেছে অশ্রুত নীল গোলাপের সংখ্যা … আজ ১২ বছর পরেও রিয়া র ভালবাসা সেই এক ই রকম রয়েছে।

গল্পের লেখকঃ    সোহেল সাইফ

Loading...

Check Also

জঙ্গীদের প্রতি ঘৃনা বাড়ানোর বড়ি!

১) আজ মুসলমান সম্প্রদায়ের এক বড় উৎসব।আমার এধরনের লেখা ঠিক হচ্ছেনা তবু দেশের পরিস্থিতি আমাকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published.