Home / STORY LESSON / বছরের পর বছর সময় নিয়ে বাবা-মা পারল না, একটা মেয়ে কিভাবে পারবে?

বছরের পর বছর সময় নিয়ে বাবা-মা পারল না, একটা মেয়ে কিভাবে পারবে?

আমি আগে একটা স্কুলে জব করতাম,সেখানকার বেশিরভাগ টিচারই ছিল মেয়ে এবং বেশিরভাগই ছিল খুব সুন্দরী সুন্দরী। সেখানে গিয়ে এক মেয়ের সাথে পরিচয় হয়। নামটা বলতে চাচ্ছিনা, ধরি ওর নাম ‘অ’, ‘অ’ ওর নামের প্রথম অক্ষর তাই ‘অ’ই নিলাম। আমি জবে ঢোকার কয়েক মাস পরে ‘অ’ জবে ঢোকে। প্রথম দিন থেকেই আমি ‘অ’কে খুব খেয়াল করে দেখি। মেয়েটাকে এক কথায় দারুন সুন্দরী বলা যায়। লম্বা পাঁচ ফিট আড়াই বা তিন, স্লিম, গায়ের রং খুব ফর্সা, পোশাক খুব মার্জিত এবং রুচিসম্পন্ন এবং হাঁটা চলায়ও ওর ব্যাক্তিত্ব বোঝা যাচ্ছিল। ঐ সময়টাতে আমার ভাইয়ের জন্য বাসা থেকে মেয়ে খোঁজা হচ্ছিল তাই মেয়েটাকে পাত্রী হিসেবে পছন্দ হয়ে গেল। ওকে খুব বেশি মাত্রায় পছন্দ হওয়ার আরেকটা কারণ হল ও দেখতে অলমোস্ট আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের মত ছিল।

যাইহোক , হুট করেইতো আর কাউকে বলা যায়না এই মেয়ে তোমাকে আমার ভাবী হিসেবে খুব পছন্দ হয়েছে, তাই একটু সময় নিলাম। আস্তে ধীরে ওর সাথে পরিচিত হলাম। সময় পেলেই ওর সাথে গল্প করতাম, আড্ডা দিতাম। আমাদের মধ্যে খুব ভাল বন্ধুত্ব হল। ও’ও সময় পেলেই আমার ক্লাসে চলে আসত, আমার সাথে টিফিন শেয়ার করত। আমি খাওয়ার আগ পর্যন্ত ও না খেয়ে বসে থাকত।

আমিতো মনেমনে ভেবেই নিয়েছিলাম এত সুন্দরী মেয়েরতো বিএফ থাকা খুবই স্বাভাবিক, তাছাড়া এই মেয়ে আমার ভাইয়ার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট হবে এবং আমার ভাইয়ের আরও কিছু ব্যাপার ছিল বলে ওর সাথে বিয়ে বিষয়ক কোন কথাই তুলিনি। পরে জানতে পারলাম ওর কারও সাথে এ্যাফেয়ার নেই। একদিন সাহস করে ওকে বলেই ফেলললাম জানো তোমাকে দেখেই আমার ভাইয়ার জন্য খুব পছন্দ হয়েছিল, কিন্তু আমার ভাই তোমার থেকে অনেক বড় তাই আমি কথা তোলার সাহস পাইনি। কথাটা শুনে ও কেমন যেন হয়ে গেল এবং এই বিষয় নিয়ে কোন কথা বলল না। আমি বুঝলাম ওর এই ব্যাপারে কোন আগ্রহ নেই তাই আমি আর কথা বাড়াইনি।

‘অ’ আমার দেখা খুব ভালো আর ভদ্র মেয়েদের মধ্যে একজন। এই যুগে এমন একটা সুন্দরী মেয়ের কারও সাথে এ্যাফেয়ার নেই জেনে খুব অবাকই লাগত। ইনফ্যাক্ট ওর বোধহয় কোন ছেলে বন্ধুও ছিলনা। ‘অ’ খুব আন্ডারস্ট্যন্ডিং, হেল্পিং মাইন্ডেড আর চমৎকার একটা মেয়ে এবং ব্রিলিয়ান্টতো বটেই, বেশ হার্ডওয়ার্কিংও। সব দিক দিয়েই ফিট বলা যায়। ও ইংলিশে অনার্স করছিল। জবে ঢোকার তিন চার মাস পরে ওর ফাইনাল পরীক্ষার জন্য ও জব ছেড়ে দেয়। কিন্তু জব ছাড়লেও সবসময়ই আমাদের মধ্যে কমিউনিকেশন ছিল। ওর কথা মনে পড়লেই ভাবতাম ও এত লক্ষি একটা মেয়ে যদি আমাদের কোন কাজিন বা কোন আত্মিয়ের বউ করে আনতে পারতাম।

আমি প্রায়ই ফেসবুকে আমার বিভিন্ন কলিগদের সাথে ছবি দিতাম বলে আমাদের অনেক রিলেটিভ আমাকে প্রায়ই বলত মেয়ে দেখতে। একদিন আমার এক আপু ওনার ভাইয়ের জন্য আমাকে মেয়ে দেখতে বলল। আমার ইন্সট্যান্ট ‘অ’ এর কথা মাথায় আসল। আমি ঐ আপুকে বললাম আমার এক কলিগ আছে, ওর সাথে কথা বলে দেখি।

এরপর ‘অ’ কে ফোন করে বললাম আমার এক আপু আমাকে তার ভাইয়ের জন্য মেয়ে দেখতে বলেছে। তুমিতো জানো তোমাকে আমার খুব পছন্দ। আমার কাছে এই কথা শুনে ও যা যা বলল তা শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।

ও বলল,যখন ও কলেজে পড়ত তখন নাকি ওর একবার বিয়ে হয়েছিল। ছেলেটা ওর চেয়ে দুই এক বছরের বড় ছিল। ছেলে অ্যামেরিকায় থাকত, খুব রিচ ফ্যামিলির ছেলে। ছেলে পক্ষ মেয়েকে দেখে খুব পছন্দ করে এবং তারা খুব আগ্রহ দেখায় বলে ‘অ’ এর মা/ আত্মীয়রা আর মানা করতে পারেনি। ‘অ’ এর বাবা অনেক আগেই মারা গিয়েছেন তাই ‘অ’ এর মা ভেবেছিলেন ভাল প্রপোজাল পেলে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিবেন। তাই উনি সেখানেই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেন। বিয়ে হওয়ার দুইএকদিনের মাথায়ই ‘অ’ জানতে পারল ওর হাজবেন্ডের হবি হচ্ছে ড্রাগস্ নেয়া। সব রকমের বাজে নেশায় সে আসক্ত ছিল। মানুষের হবি যে এই রকম খারাপ কিছু হতে পারে এইটা ওর অজানা ছিল। ‘অ’ অনেক চেষ্টা করেছে ছেলেটাকে ভাল পথে ফিরিয়ে আনার। কিন্তু ছেলে সব কিছু ছাড়লেও ড্রাগস্ ছাড়তে পারবেনা। সে ‘অ’র সাথে অনেক খারাপ ব্যাবহার করত।

‘অ’র ফ্যামিলি সব জানতে পেরে ছেলের ফ্যামিলিকে জিজ্ঞেস করেছিল কেন তারা বিয়ের আগে ব্যাপারটা হাইড করেছে, পরে ছেলে পক্ষে জানায় তারা বহু বছর ধরে চেষ্টা করছিল ছেলেকে এ্যাডিকশণ থেকে ফেরানোর, কিন্তু তারা ব্যার্থ হয়েছে। পরে কে নাকি বুদ্ধি দিয়েছে সুন্দরী মেয়ে দেখে বিয়ে দিয়ে দিতে। সুন্দরী বউ পেলে নাকি ছেলে ঠিক হয়ে যাবে। সেই বুদ্ধি পেয়ে ছেলের মা বাবা ‘অ’ কে বলির পাঠা বানিয়েছে।

‘অ’ এর ফ্যামিলি ‘অ’ কে বলেছিল ঐ ছেলেকে ডিভোর্স দিয়ে চলে আসতে, কিন্তু ‘অ’ সময় চেয়েছিল। ও বলেছে তোমাদের দেখে শুনে খোঁজ নিয়ে ডিসিশন নেয়া উচিত ছিল, তোমরা ভুল করেছ আমি দেখি সেই ভুল শুধরাতে পারি কিনা। একটা ১৮/১৯ বছরের মেয়ে কতটুকুই বোঝে, তবু সেই মেয়েটা ধৈর্য্য ধরে ভালবেসে চেষ্টা করেছিল তার স্বামীকে সুস্থ পথে ফিরিয়ে আনার। কিন্তু বিনিময়ে সে অবহেলা আর অত্যাচারের স্বীকার হয়েছে। ‘অ’ দিনের পর দিন বোঝানোর পরেও যখন দেখল সেই ছেলেকে কোন মতেই ফেরানো সম্ভবনা, পরে আর টিকতে না পেরে এক বছরের মাথায় ও ডিভোর্স দিতে বাধ্য হয়।
সব বলা শেষে ‘অ’ আমাকে বলল একটা ছেলেকে তার ফ্যামিলি বছরের পর বছর ঠিক করতে পারলোনা, তারা কিভাবে আশা করে একটা মেয়ে এসে ওভার আ নাইট ছেলেকে ঠিক করে দিবে? নিজের মা বাবা হাজার চেষ্টা করে যা পারেনি একটা মেয়ে এসে কিভাবে সেইটা ঠিক করতে পারবে? আমি সব কথা শুনে কি বলব কি বলব ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলামনা। তবে যদি ঠিক ঐ পরিস্থিতিতে ‘অ’ আমাকে কথা গুলো বলত তখন হয়ত আমি বলতাম আর কিছুদিন ধৈর্য্য ধরে চেষ্টা করে যেতে।

‘অ’ যখন আমাকে কথা গুলো বলছিল তখন আমার বুকটা ভারী হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ও খুব স্বাভাবিক স্বরে কথা গুলো বলছিল। ওর কথার স্বাভাবিকত্ব দেখে আমি বুঝতে পারছিলাম এই ঘা টা ওর অনেক পুরোনো,তবে সেই ঘায়ের ব্যাথা সেরে গেলেও ক্ষতটা রয়ে গেছে। ও সেই দু:স্বপ্ন থেকে বেরিয়ে আসলেও সমাজ সেখান থেকে বের হতে পারেনি। সেই ঘটনার পরে ‘অ’ আর কারও সাথে কোন রকম সম্পর্কে জড়ায়নি। বিয়ের প্রপোজাল অনেক এসেছে, কিন্তু সব কিছু জেনে নাকি কেউ আর এগোয়নি। আজ অবধি কেউ সাহস করে ভালবেসে ওর হাতটা ধরে বলেনি এসো তোমার হৃদয়ের সেই ক্ষতটা মুছে দেই…

সব বলা শেষে ও আমাকে বলল যদি আমি ওর জন্য কোন ছেলে দেখি তাহলে যেন ওর জীবনের কথা গুলোও তাকে জানাই, সব জেনে কেউ যদি আসে তাহলে ওর কোন সমস্যা নেই।

আমি সেদিন আর ওকে কিছু বলতে পারিনি। সারাক্ষণ শুধু মাথায় চলছিল এই কলঙ্কিত যুগেও ওর মত একটা পবিত্র মেয়ে আর হয়না। আজকাল ভালবাসার নামে সবাই যা করছে সেসব নোংড়ামী থেকে ও অনেক উর্ধ্বে। এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি না হওয়ারতো কোন কারণ নেই? সংসার ভাঙা একটা মেয়েতো আরও ভাল বুঝবে সংসারের মূল্য কি। এমন একটা মেয়ে নতুন করে যদি নিজের সংসারে প্রবেশ করে সেতো তার প্রাণ উজার করা ভালবাসা দিয়ে স্বামী এবং সংসারকে আগলে রাখবে। আমার মনে হতে লাগল এমন একটা মেয়েকেতো সবার আরও আগে বিয়ে করতে রাজি হওয়ার কথা।

নিজের এই সকল চিন্তা ভাবনা নিয়ে ঐ আপুকে সব ঘটনা খুলে বললাম। ‘অ’ এর লাইফে এই এই ঘটনা ঘটেছে। সব শুনেই ঐ আপু চুপ হয়ে গেলেন। আমি ঐ আপুকে ‘অ’ এর কিছু ছবি পাঠিয়ে বললাম আপু ওর মত মেয়ে হয়না। ভাইয়া অনেক সুখে থাকবে ইনশা আল্লাহ্। আমি এই মেয়েকে যতটুকু দেখেছি ওর মত ভদ্র মেয়ে খুব রেয়ার। আমি বুঝলামনা ঐ আপু কেন ‘অ’ কে নিজের ভাইয়ের জন্য বিয়ে করাতে রাজি হল না। উনি কারণ দেখালেন আসলে কোন ছেলেতো এইটা মানতে পারেনা যে তার স্ত্রী আগে সংসার করে এসেছে। তার আগে বলি, ততদিন আমার বড় ভাইয়ার বিয়ে হয়ে গেছে তাই নিজের ভাইকে নিয়ে আর কিছু ভাবতে পারিনি। কিন্তু আমার শুধু মনে হচ্ছিল আমি ছেলে হলে ব্যাক্তিগতভাবে এই মেয়েকে বিয়ে করতে আমার কোনই সমস্যা ছিলনা।

আজকাল বিয়ের আগেই মানুষ দিনের পর দিন স্বামী স্ত্রীর মত থাকে, যখন তাদের মধ্যে ব্রেকআপ হয় তখন কি তাদের অন্য কোথাও বিয়ে হচ্ছেনা? সেইসব ছেলে মেয়েরা কি তাহলে দুধে ধোয়া তুলসি পাতা? তাদের যদি বিয়ে হতে পারে তাহলে ‘অ’ এর দোষ কোথায় ? আমার দৃষ্টিতে ঐসব ছেলেমেয়েদের চাইতে ‘অ’ পাত্রী হিসেবে বেশি গ্রহণযোগ্য। আমার নিজের পরিচিত অনেককেই দেখেছি বিয়ের আগে অ্যাবর্শন করিয়েছে এবং তাদের মধ্যে একজনের রিসেন্টলি বিয়েও হয়েছে। আমি নিশ্চিত ও বিয়ের আগে ওর সেই আগের কাহিনী প্রকাশ করেনি, অথচ ওর বিয়ে ঠিকই হয়েছে। তখন কি পুরুষ মানুষ গুলোর মাথায় একবারও এই চিন্তা আসেনা যে আমার স্ত্রী বিয়ের আগে কিছু করেছে কিনা?

আসল কথা হল আমরা না জেনে অনেক খারাপ কিছু গ্রহণ করি কিন্তু জেনে বুঝে অনেক সময় খুব ভাল কিছুও গ্রহণ করতে পারিনা। করবো কিভাবে? ভাল কিছু পেতে হলে সেই রকম সৌভাগ্যবানতো হওয়া লাগবে।

আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি ‘অ’ কে যে পাবে সে পৃথিবীর অন্যতম একজন সৌভাগ্যবান পুরুষ হবে। আমি অপেক্ষায় আছি সেই সুন্দর হৃদয়ের অধিকারী সৌভাগ্যবান মানুষটাকে দেখার জন্যে….

(বি:দ্র: আমি খুব গুছিয়ে কথা লিখতে পারিনা এবং লিখতে গেলে অনেক ভুল করি, তাই কোথাও ভুল ত্রুটি হলে সবাই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন)

লেখিকা: ফাতিমা আক্তার

Loading...

Check Also

সোহাগী জাহান তনুর খোলা চিঠি…

আমি সোহাগী জাহান তনু বলছি। চোখে অশ্রু আর এক বুক যন্ত্রনা নিয়ে লিখতে বসেছি। কখনো …

Leave a Reply

Your email address will not be published.