Home / STORY LESSON / সমাজের পতিতা! কেমন আছে সেই নিষিদ্ধ পল্লীর মেয়েটি। পর্ব-১

সমাজের পতিতা! কেমন আছে সেই নিষিদ্ধ পল্লীর মেয়েটি। পর্ব-১

হাজার বছরের এক পুরাতন ব্যবসার নাম পতিতাবৃত্তি। লোকমুখে আরো বিচিত্র নাম আছে এর গণিকাবৃত্তি, বেশ্যাবৃত্তি, দেহব্যবসা ইত্যাদি। বিচিত্র এই দোকানীরাই আমাদের সমাজে পতিতা, গণিকা, বেশ্যা, রক্ষিতা নানাভাবে পরিগণিত হয়। যে প্রতিষ্ঠানে তারা বিক্রি করে মাপ-পরিমাপহীন এই পণ্য সেটিই পতিতালয়, গণিকালয় বা বেশ্যালয়। সভ্যতার বিবেচনায় একে অন্ধকার গলি বলা হয়ে থাকে। হয়তো অন্ধকার গলি বলেই আলোর ব্যাপক মানুষেরা চেনে না এ গলি, জানে না এ জগৎ। কিন্তু তারপরও সত্য, কৃষ্ণ গহ্বরের মত অস্তিত্বমান এই অন্ধকার গলি। খুব সুনির্দিষ্ট করে হয়তো বা বলা মুশকিল পৃথিবীর ইতিহাসে কবে কখন কিভাবে উৎপত্তি ঘটেছে বিচিত্র এ ব্যবসার। তবে যতদুর জানা যায় মধ্যযুগীয় বর্বরতার গর্ভে অর্থাৎ সামন্তীয় সমাজের পাপের ফসল এই পতিতাবৃত্তি। সেই অবধি দুনিয়াব্যাপী বিস্তৃতি এ ব্যবসার। প্রাচীন জনপদ যশোরের কেন্দ্রবিন্দু পৌর এলাকায়ও রয়েছে এর ধারাবাহিক ঐতিহ্য। বর্তমানে শহরের ৩টি এলাকার ৭টি পতিতালয়ের রয়েছে বৈধ অনুমতি। মোট ১৩৪টি ঘরে ঘরওয়ালি দিয়ে মেয়ের সংখ্যা আছে ৪৩৭ জন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে মাড়োয়ারী মন্দির এলাকার এক নং গলিতে জনৈক ডাঃ ইয়াকুবের বাড়িতে ২৪টি ঘরে মেয়ের সংখ্যা ৪৮ জন। পায়খানা আছে ২টি, টিউবওয়েল ১টি। মাড়োয়ারী মন্দির এলাকার মাঝের গলি বা দুই নং গলিতে ঘর আছে ১৬টি, মেয়ের সংখ্যা ৩২ জন। এখানে ১টি পায়খানা ও ১টি টিউবওয়েল রয়েছে। মাড়োয়ারী মন্দির এলাকার তিন নং গলিতে ২৭টি ঘরে মোট মেয়ের সংখ্যা ৮১ জন। এই ব্যবসার সাথে এক কালে জড়িত ছিল জনৈক মেরি এ বাড়ির মালিক। এখানে পায়খানা আছে ২টি, খাবার পানির জন্য টিউবওয়েল আছে ২টি এবং ধোয়া পাখলা ও গোসলের জন্য পৌরসভার সাপ্লায়ের কল আছে ২টি। তিনটি গলিতেই নাইট গার্ড আছে ২/২ জন করে। এছাড়া রয়েছে একেকটি গলিতে একাধিক রাধুনি, এক সময়ের পতিতা। জীবন-যৌবন হারিয়ে এখন এরা মৃত্যু পথযাত্রী-‘মাসি’। এদের সাথে আলাপে জানা গেছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বিশেষ করে রংপুর, দিনাজপুর, ঢাকা, বরিশাল, ফরিদপুর, নড়াইল, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, যশোরের প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চল এমনকি শহরেরও অনেক দিনমজুর পরিবারের মেয়েরা এই অন্ধকার গলির বাসিন্দা।

 

জানা গেছে, বাবা মার সংসারের অভাব, স্বামীর নির্যাতন, প্রেমিকের প্রতারণা, অবুঝ অবস্থায় হারিয়ে যাওয়া এবং দুষ্ট লোকের খপ্পরে তারা এই নিষিদ্ধ গলির অস্পৃশ্য প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। কথা হচ্ছিল মাড়োয়ারী মন্দির এলাকার এক নং গলির বাসিন্দা রুনার সাথে। বাড়ি ঢাকায়। তিন ভাইবোনের মধ্যে সে দ্বিতীয়, ভাই সকলের ছোট। বাবা মারা গেছে অনেক আগে। বড় বোন বিয়ের পরে এক মেয়ে রেখে মারা গেছে, ঐ মেয়ে এখন মা’র কাছে। রুনার বিয়ে হয়েছিল। সেখানে দুই ছেলেমেয়ে। স্বামী ২য় বিয়ে করে, তাই নিয়ে সংসারে প্রায় দ্বন্দ্ব হতো। এক পর্যায়ে স্বামী তাকে তালাক দেয়। দিনমজুর স্বামীর কাছ থেকে সে দুই বাচ্চা নিয়ে এসে ওঠে মা’র কাছে। মা’র সংসারে একমাত্র উপার্জক ছোট ভাই। গার্মেন্টসে কাজ করে। মাসে দেড় হাজার টাকা আয়। ইতিমধ্যে সংসারে সদস্য সংখ্যা হয়ে গেছে ৬ জন। বাবার কোন মাঠান জমি নেই। সব কিছুই কিনে খেতে হয়। অভাবে এই সংসারে মা’র সাথে প্রায়ই ঝগড়া হত। তারপর থেকে সে এখানে। কিভাবে আসলো এবং এ গলির সন্ধান পেলো এ প্রশ্নের উত্তরে সে নীরব। এখন কেমন চলছে জানতে চাইলে বলে ভাল। এখানে তাকে মাসে ঘর ভাড়া (বাড়িওয়ালীকে) দিতে হয় ১৫শ’ টাকা। প্রতিদিন যত পুরুষ আসে তার কাছে সে কাওকে ফিরায় না। দামে পোষালেই সে রাজি হয়। পুরুষ প্রতি ১০০/২০০ টাকা থেকে যে যা দেয় এই টাকা থেকে মা’র সংসারে (মা, ভাই, বোনের মেয়ে, নিজের ২ ছেলে মেয়ে) দেয়। মা জানে রুনা গার্মেন্টসে চাকরি করে। বছরে ২/১ বার সে বাড়িতে যায়। এক প্রশ্নের উত্তরে সে জানায় “এইহানে সাইজা-গুইজা থাহি, প্রতিদিন সাবানসহ স্নো-পাউডার মাখি, দেইখা অনেকেই ভালবাসে বিয়ের প্রস্তাব দেয় কিন্তু রাজি হই না, দেখিতো-সবাই আবার ফিরে আসে। পতিতার সাথে কেউ সংসার করে বলেন? আসলে আমাদের কষ্টে জমানো টাকা, সোনা-গহনার লোভেই অনেকে বিয়ের কথা বলে। ঐ গুলি হাতিয়ে নিয়ে আবার ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তখন আর কোথাও জাগা হয় না। থাক ঐ সব কথা লেইখা আর কি হইব বলেন?”

মাড়োয়ারী মন্দির পতিতালয় :

মাড়োয়ারী মন্দির এলাকার নিষিদ্ধ তিনটি পল্লী অনুসন্ধানে জানা গেছে, এপেশা সম্পর্কে মানুষ যতই নাক সিটকাক না কেন এর সাথে জড়িত রয়েছে অগণিত মানুষের ভাতের যোগান। কেবল মাত্র ব্যক্তি মেয়ের (পতিতা) জীবন না বরং জড়িত রয়েছে তাদের (পতিতা) পরিবার, বাড়ির মালিক, ঘরওয়ালি, নাইটগার্ড, রাঁধুনি (মাসি), মদের দোকানদার, পান-বিড়ি বিক্রেতাসহ বিভিন্ন ধরণের হকার, যাদের জীবনের অর্থনৈতিক যোগান সরাসরি এই ব্যবসার সাথে জড়িত। এছাড়াও রয়েছে পরোক্ষ উপার্জন, সরকার ও স্থানীয় সরকারের নানা ধরণের কর আদায়। এদের সাথে আলাপে জানা গেছে, মাড়োয়ারী মন্দির এলাকার এক নং গলির মালিক ডাঃ ইয়াকুব তার ২৪টি ঘর থেকে ভাড়া বাবদ দিন ১০০ টাকা হারে মাসে ৭২ হাজার টাকা আয় করে।

Loading...

Check Also

সোহাগী জাহান তনুর খোলা চিঠি…

আমি সোহাগী জাহান তনু বলছি। চোখে অশ্রু আর এক বুক যন্ত্রনা নিয়ে লিখতে বসেছি। কখনো …

Leave a Reply

Your email address will not be published.